• Home »
  • Uncategorized »
  • ঝিনাইদহে নলকূপের পানিতে সারছে রোগ, শত শত মানুষের ভিড়

ঝিনাইদহে নলকূপের পানিতে সারছে রোগ, শত শত মানুষের ভিড়

ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি: সরকারি অর্থায়নে নিজের এলাকায় বসানো একটি নলকূপকে অলৌকিক বলে গুজব রটানোর অভিযোগ উঠেছে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মধুহাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জুয়েল হোসেনের বিরুদ্ধে। ওই চেয়ারম্যান দাবি করেছেন, নলকূপের পানি পান করে তার দীর্ঘদিনের কাশি সেরেছে। চেয়ারম্যানের এমন দাবির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ওই নলকূপ ঘিরে রোগমুক্তি প্রত্যাশী মানুষের ভিড় বেড়েছে।

যদিও ইউপি চেয়ারম্যানের এমন দাবিকে গুজব বলে মনে করছেন জেলা সিভিল সার্জনসহ এলাকার সচেতন মানুষ। একজন জনপ্রতিনিধির এমন দাবিতে ইউনিয়নবাসীর মধ্যে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

ঘটনাটি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বাজার গোপালপুরের টাওয়ার পাড়া এলাকার।

নিজের রোগ মুক্তির কথা বলে ইউপি চেয়ারম্যান খাসি জবাই করে হাজার তিনেক মানুষের গত শুক্রবার (৫ জুলাই) কাঙালি ভোজের আয়োজন করেন। তাতেই ইউপি চেয়ারম্যানের রোগমুক্তির খবরটি চাওর হয়ে যায়। ওই নলকূপ থেকে পানি নেওয়ার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসতে শুরু করেছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাজার গোপালপুরের এই নলকূপটির পানি নেওয়ার জন্য ঝিনাইদহ জেলা ও আশেপাশের এলাকা থেকে লোকজন আসছেন। বাত-ব্যথা, টিউমার, জন্ডিস, ক্যান্সার প্রভৃতি রোগীরা আসছেন সুস্থতার জন্য।

এতে বাজার গোপালপুরে কাক ডাকা ভোর থেকে মধ্যরাত অবধি জটলা দেখা দিচ্ছে। লোকজন যাতে নির্বিঘ্নে পানি নিতে পারে এ জন্য জুয়েল চেয়ারম্যান নলকূপে মোটর লাগিয়েছেন। পানি নেওয়ার জন্য শতাধিক স্বেচ্ছাসেবকও নিয়োগ দিয়েছেন তিনি।

স্থানীয় লোকজন জানান, রোজার কয়েকদিন আগে মাঠের কৃষকদের মাঝে সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ইউপি চেয়ারম্যান সরকারি বরাদ্দের টাকা খরচ করে ওই নলকূপ স্থাপন করেন। নিজের বসানো নলকূপের সুনাম ছড়ানোর জন্য চেয়ারম্যান এ গুজব রটিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

মধুহাটি গ্রামের একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডাকুয়াকে বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান এ গুজব রটিয়েছেন। এতে বাজার গোপালপুরের স্থানীয়দের ব্যবসা জমে উঠেছে। কেউ কেউ খালি বোতল বিক্রি শুরু করেছেন।

শ্যামনগর গ্রামের একজন চাকরিজীবী বলেন, এটা গুজব সেটি সচেতন মানুষ বুঝতে পেরেছে। পানিতে রোগ সারলে তাহলে ডাক্তার আর ওষুধের দরকার পড়ত না। ইউপি চেয়ারম্যান খাসি জবাই করে মানুষকে খাইয়েছে। যাতে তার সুনাম ছড়ায়।

পানি নিতে এসে কেউ কেউ আবার ভোগান্তির স্বীকার হচ্ছেন। অনেকে পানি সংগ্রহ করতে এসেছে তাকে দাঁড়াতে হচ্ছে দীর্ঘ লাইনে।

পানি নিতে আসা একজন রোগী বলেন, এই টিউবওয়েলের পানি খেয়ে ল্যাংড়া প্রতিবন্ধী মানুষও ভালো হয়েছে। আমরা সেরকমটা জেনেই এয়েচি। সকাল ৯টায় এয়েচি। এখন দুপুর ১২টা বাজে এখনও পানি পাইনি।

তবে পানি নিতে এসে অনেকে ঢেলা, গুঁতো, ঘাইগুঁতো মারও খেয়ে যাচ্ছে বলে এ নারী দাবি করেন।

অপর এক নারী বলেন, এখানে আইছি যে একটা রোগের কথা বুলে আসতি হবে। এখান থেকে পানি নিলে ভালো হয়ে যাবে। তবে রোগ ভালো করার মালিক আল্লাহ।

নলকূপের পানি নিতে আসা হাটগোপালপুর গ্রামের নজির উদ্দিন বলেন, তার পিতা দীর্ঘদিন প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। নলকূপের পানি পান করে রোগমুক্তি হবে এ কথা শুনে তিনি পানি নিতে এসেছেন। ইউপি চেয়ারম্যান নিজ হাতে এই পানি দিচ্ছেন।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান, তিনি দীর্ঘদিন প্যারালাইজড। এ নলকূপের পানি পান করে রোগমুক্তির আশায় তিনি সেখানে যান এবং পানি পান করেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি।

ইউপি চেয়ারম্যান জুয়েল হোসেন বলেন, আমি খোলা মনে এই টিউবওয়েলের পানি পান করেছি। এতে আমার দীর্ঘদিনের কাশি কমে গেছে। আমি এই কাশির জন্য ইন্ডিয়াতে গিয়েও ভালো হইনি, এবার ভালো হয়ে গেছি।

ইউপি চেয়ারম্যান আরও বলেন, এক লোকের ব্যথা ছিল। ব্যথায় নড়াচড়া করতে পারতেন না। এই টিউবওয়েলের পানি খেয়ে ও এখানে গোসল করে তিনি নিরাময় পেয়েছেন। এছাড়া আমার মা অসুস্থ ছিল। তিনিও এই পানি খেয়ে ভালো হয়ে গেছেন। পাড়া-প্রতিবেশী অনেকে উপকার পেয়েছে।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার প্রসেনজিৎ বিশ্বাস পার্থ বলেন, ভুল বিশ্বাস থেকে মানুষ নলকূপের পানি নিতে আসছে। এটি অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার।

এ ব্যাপারে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাম্মী ইসলাম বলেন, এই ঘটনার খবর তিনি পেয়েছেন। ঘটনাস্থলের গিয়ে দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।

তিনি বলেন, এই পানি খেলে রোগ ভালো হচ্ছে, এটা কোথা থেকে ছড়াল, কারা কী উদ্দেশ্যে নিয়ে ছড়াল, সেটাও তদন্ত করা হবে।

জেলা সিভিল সার্জন সেলিনা বেগম বলেন, আমরা ঘটনাটি জেনেছি। এটির সঙ্গে বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। তারপরও ওই নলকূপ ও আশেপাশের কয়েকটি নলকূপের পানি পরীক্ষার জন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগে পাঠিয়েছি। আমরা দেখতে চাই ওই নলকূপের পানির সঙ্গে অন্য নলকূপের পানির কোনো মিল-অমিল আছে কি না?

একজন জনপ্রতিনিধি দাবি করেছেন তার রোগ সেরেছে মন্তব্য জানতে চাইলে সিভিল সার্জন বলেন, আমরা প্রয়োজনে ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলব। এর আগে পানি পরীক্ষার প্রতিবেদনটা দরকার। নলকূপের পানিতে রোগমুক্তি হয় এমন তথ্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে নেই। যারা পানি নিচ্ছে বা পান করছে তারা গুজবে কান দিয়ে সেখানে ভিড় করছে বলেই আমরা মনে করি।

মন্তব্য করুন