• Home »
  • Uncategorized »
  • মাত্র ৪ হাজার টাকায় ঘুরে আসুন দার্জিলিং

মাত্র ৪ হাজার টাকায় ঘুরে আসুন দার্জিলিং

হয়তো কেউ কেউ চোখ কুঁচকে ফেলে ভাবছেন, এটা কি হয় নাকি। আবার কেউ বলছেন, এ কেমন কিপ্টে রে বাবা!

যে যাই বলুক আর ভাবুক আপনি চাইলেই স্বল্প খরচে ঘুরে আসতে পারেন আদি ও অকৃত্রিম দার্জিলিং মাত্র ৩৮০০ টাকায়। হ্যা, মাত্র তিন হাজার আটশত টাকায়। কিন্তু কীভাবে?
সেটাই বলছি।

পাসপোর্ট ভিসা হয়ে গেলে গাবতলী থেকে রাত ৮ টা কিংবা ৯ টার বাসে উঠে চলে যান সোজা বুড়িমারি বর্ডারে। নাবিল পরিবহনে ভাড়া নেবে ৬৫০ টাকা। নন এসি। বাস গিয়ে বুড়িমারি পৌছুবে আনুমানিক পরদিন সকাল ৮ টা বা ৯ টায়। বাস থেকে নামামাত্র দালালরা আপনাকে ছেঁকে ধরার সম্ভাবনা প্রবল। আপনি ওদের ছায়াও মাড়াবেন না। কারণ আপনার তো ডলার এন্ডোর্স এবং ট্রাভেল ট্যাক্স দেয়াই আছে(যদি দেয়া না থাকে তাহলে অবশ্যই ঢাকা থেকে এসব টুকটাক ঝামেলা শেষ করে আসবেন) নাবিল পরিবহনের কাউন্টারের সাথেই ওদের স্বল্পমেয়াদী “অবকাশ যাপন” কেন্দ্র। সেখানে আপনি বিশ্রাম এবং ফ্রেশ হয়ে নিতে পারবেন। ফ্রেশ হয়ে দেরী না করে চলে যান পাশেই একমাত্র খাবার হোটেল “বুড়ির হোটেলে”। হোটেলে সত্যি সত্যি একজন রগচটা স্বভাবের বুড়ি পাবেন। আমরা যেবার গিয়েছিলাম বুড়ির রোষানলে পড়ে নাজেহাল দশা। আর বুড়ির সাথে অবশ্যই মিষ্টি সুরে কথা বলবেন।

জলখাবারের জন্য রাখুন ৭০ টাকা। যাইহোক, খাবার যদি পেয়ে যান সাথে সাথে তবে ভাল, অন্যথায় কালক্ষেপণ না করে হালকা কিছু খেয়ে চলে যান বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনে। সেখানে নিজে নিজেই লাইনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে ফেলুন। ইমিগ্রেশন অফিসার আপনার কাছে চা পান খাবার জন্য কিছু দাবি করতে পারে। ২০/৩০ টাকা দিয়ে দিন। এরপর পাসপোর্ট বুঝে নিয়ে চলে যান কাস্টমসে। দালালরা ইনিয়ে বিনিয়ে নানান কথা বলবে। কান দেবেন না। কাস্টমসে আপনার নাম ও ডাটা এন্ট্রি শেষ হলেই আপনার বাংলাদেশের কাজ শেষ। এরপর ইন্ডিয়ার পালা। বাংলাদেশ কাস্টমসের ঝামেলা শেষ করে সোজা চলে যান ইন্ডিয়ান কাস্টমসে। সেখানে আপনার পাসপোর্টের ডাটা যে এন্ট্রি করবে সেও কিছু টাকা দাবি করতে পারে। ৫০ টাকা এখানেও দিয়ে দিন। না দিলেও হয়, দাদারা এদিক থেকে বেশ উদার। এরপর লাইনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলুন। মনে রাখবেন আগে ছবি তোলার জন্য কখনও লাইন ত্যাগ করবেন না। এরা বিশৃঙ্খলা পছন্দ করেনা। ছবি তোলা হলে চলে যান কাস্টমসে। সেখানে আপনার ব্যাকপ্যাক, লাগেজ ইত্যাদি তল্লাশি করতে অফিসারকে সাহায্য করুন। এরপর যদি আপনার ডলার ভাঙাতে হয়, কিংবা পর্যাপ্ত টাকা রুপি করা না থাকে চলে যান কোন একটা মানি এক্সচেঞ্জে। আপনার প্রয়োজনমত টাকা রুপি করে নিন। প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশিই করে নিন। সতর্ক থাকা ভালো। কখন কোন প্রয়োজন হয়। আমরা বর্ডারে বেশ ভাল রেট পেয়েছিলাম। ঘাবড়ানোর কিছু নেই; ইন্ডিয়ান কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, মানি এক্সচেঞ্জ ইত্যাদি সবকিছুই কাছাকাছি জায়গায়। কোনটা থেকে কোনটার দূরত্ব বিশ ত্রিশ কদমের বেশি না। যত দ্রুত সম্ভব এগুলো শেষ করে ইঞ্জিনচালিত অটোতে করে চলে যান চ্যাংড়াবান্ধা বাস স্ট্যান্ড। উঠে পড়ুন শিলিগুড়ির বাসে। ১০০ রুপি নেবে জনপ্রতি। শিলিগুড়ি পৌছুতে প্রায় ৩ ঘন্টা লেগে যাবে। সারাদিন তো কিছুই খাননি। শিলিগুড়ি বাসস্ট্যান্ড এবং রেল স্টেশন এক জায়গাতে। খাবারের জন্য হোটেলও মিলবে প্রচুর। খাবারের জন্য বাজেট রাখুন ১২০ রুপি। সেখানে কোন একটায় ঢুকে পড়ুন কালবিলম্ব না করে। মনে রাখবেন আপনার এখনও অনেকটা পথ বাকি। এ জাতীয় কাজে যথাসম্ভব সময় কম ব্যয় করার চেষ্টা করবেন। খাওয়া হয়ে গেলে শিলিগুড়ি স্ট্যান্ড থেকে উঠে পড়ুন শেয়ার জীপে। ভাড়া নেবে ১৪০ রুপি। দার্জিলিং যেতে সময় লাগবে কমবেশি তিন ঘণ্টা। দার্জিলিং পৌছে দেখবেন রাত নেমে গেছে। সেই সাথে অন্যরকম শীতের আমেজ। আগে কখনও দার্জিলিং গিয়ে না থাকলে পার্থক্যটা বুঝবেন। নির্মল বিশুদ্ধ বাতাস, সেই সাথে গা-কাঁপানো শীত। আপনি রোমাঞ্চিত হবেন। পুলকিত হবেন। টেনে টেনে বিশুদ্ধ অক্সিজেন ভেতরে নিবেন অবচেতনভাবে। এবার রোমাঞ্চের লাগাম টেনে ধরুন। আপনি কিন্তু এখনও হোটেল ঠিক করেননি। মল রোড ধরে চলে যান বড় মসজিদের রাস্তায়। একটু খুঁজলে মাত্র ৫০০ থেকে ৫৫০ রুপিতে পেয়ে যাবেন মনোরম থাকার জায়গা। গিজার আছে কিনা হোটেলে ওঠার আগে দেখে নিন। পানি প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। বেশ দুঃসাহসী না হলে এই পানি দিয়ে গোসল করা দুরূহ। হোটেলে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিন এবং ঘড়ির দিকে লক্ষ্য রাখুন। রাতের খাবার নিয়ে বেগ পোহাতে না চাইলে রাত ন’টা বাজার আগেই চলে যান বড় মসজিদের পাশে মুসলিম হোটেলে। সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা অনুভূতি পাবেন। বিদেশ বিভূঁইয়ে আবার কোথায় মসজিদ পান না পান। মুসলিম হোটেলে বেশ সস্তায় গরুর গোসত মিলবে। বাজেট রাখুন ১২০ থেকে ১৫০ রুপি। তৃপ্তির ঢেকুর তুলে এবার নেমে পড়ুন রাস্তায়।

নিঃঝুম নিস্তব্ধ হয়ে যাবে ততক্ষণে আশপাশ। ভয় পাবেন না। টুরিস্টদের জন্য এখন সেটা অভয়ারণ্য। নির্জন উঁচুনিচু পথ ধরে দার্জিলিংয়ের নাগরিক পথে হাঁটুন। উপভোগ করুন। সারাদিনের ধকল শেষে আপনি নিশ্চয়ই ক্লান্ত হয়ে গেছেন। হোটেলে চলে যান। ঘুমিয়ে পড়ুন। পরদিন টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয় দেখতে চাইলে খুব ভোরে বেরিয়ে পড়ুন। সুপার মার্কেটের সামনে জীপ স্ট্যান্ড থেকে শেয়ারজীপে করে চলে যান টাইগার হিল। ৫০ রুপি বাজেট রাখুন। কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় যখন ভোরের কাঁচা রোদ প্রতিফলিত হয় অপার্থিব সৌন্দর্য নেমে আসে মর্ত্যে। চকিতে আপনার মনে হবে, আপনার জীবনের দেখা অন্যতম সেরা দৃশ্য এটি। দেখা শেষ করে আবার ফিরে আসুন ৫০ রুপিতে। দার্জিলিং ট্রিপে পায়ে হেঁটেই আপনি বেশ ক’টা স্পট ঘুরতে পারবেন।
বাতাসিয়া লুপ, পিস প্যাগোডা,জাপানিস টেম্পল, ঘুম মনেস্ট্রি, টি-গার্ডেন, হিমালয়ান মাউন্টেইনারিং ইন্সটিটিউট, তেনজিন রক ক্লাইম্বিং ইত্যাদি। দার্জিলিং স্টেশন থেকে অল্প সময় লাগে এই স্পটগুলো ঘুরতে এবং প্রতিটা জায়গা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার ভিউ খুব দারুণভাবে পাওয়া যায়। সকালে নাস্তার জন্য খেতে পারেন স্থানীয় মমো এবং পানি নুডলস। খরচ পড়বে ৪০ রুপি। সারাদিনের তিনবেলা খাবারের জন্য আলাদা করে রাখুন ৩০০ রুপি।

বিকেলে ফিরে আসুন হোটেলে। বিছানায় সামান্য গড়িয়ে নিন। সন্ধায় বেরিয়ে পড়ুন মলরোডে। স্থানীয় বাজার আপনাকে মোহিত করবে। সস্তা,কম দাম সবকিছু। চাইলে কেনাকাটা করতে পারেন। কিন্তু সেটা ৩,৮০০ টাকার বাইরে অবশ্যই। বিগবাজার শপিংয়ের জন্য বেশ ভালো। জিনিসপত্রের দামও হাতের নাগালে। কেনাকাটা করে হাতের জিনিস হোটেলে রেখে যথারীতি ৯ টার আগে চলে যান মুসলিম হোটেলে। খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে হোটেলে ফিরুন। পরেরদিন ফেরার পালা। সকাল নয়টার মধ্যে হোটেল চেক-আউট করে রিসেপশন থেকে পাসপোর্ট বুঝে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। সকালের নাস্তা হালকা কিছু খেয়ে নিন। খরচ ৫০-৭০ রুপি। চলে যান মোটর স্ট্যান্ডে। ১৪০ রুপিতে শেয়ার জীপে শিলিগুড়ি।

শিলিগুড়িতে দুপুরের খাবার ভালোভাবে খেয়ে নিন ১২০ রুপিতে। এবং মহানন্দা ব্রীজের ওপারে নিউ মোটর স্ট্যান্ড থেকে উঠে পড়ুন বাসে। ১০০ রুপি। মনে রাখুন, চ্যাংড়াবান্ধা আপনার পৌছুতে হবে বিকাল সাড়ে ৪ টার মধ্যে। ৫ টায় ইমিগ্রেশন বন্ধ হয়ে যায়। কাস্টমসের কাজ সেরে ৫টা/৫ঃ৩০ এর মধ্যে ঢুকে পড়ুন বাংলাদেশে। দুই দেশের ইমিগ্রেশনে “ঘুষের” জন্য রাখুন আরও ১০০ রুপি। সন্ধা ৬ টায় উঠে পড়ুন বাসে। ৬৫০ টাকা। ব্যস হয়ে গেলো আপনার ৩,৮০০ টাকায় দার্জিলিং ঘোরা। সময় থাকলে আজই ব্যাগট্যাগ বেধে বেরিয়ে পড়ুন অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি  দার্জিলিংয়ের উদ্দেশ্যে।

খরচ- বাংলাদেশী টাকা (৬৫০+৬৫০+৭০+৩০+৫০)= ১৩৬০/=
ইন্ডিয়ান রুপি- (১০০+১২০+১৪০+৫০০+১২০+১০০+৩০০+৫০+১৪০+১২০+১০০+১০০)= ১৮৯০ রুপি।
বাংলাদেশী টাকায় কনভার্ট করলে- ২৪১২/=
সর্বমোট- (১৩৬০+২৪১২)= ৩,৭৭২/= টাকা।

মন্তব্য করুন