অন্যরকম মানুষ

Library book distribution 001

জেলা প্রতিনিধি, ঝিনাইদহঃ ঝিনাইদহ সদর উপজেলার নগর বাথান বাজারে ঢুকেই জহির রায়হানের খোঁজ করতে নজর আটকে গেল বাজারের কয়েকটি গাছে। প্রতিটি গাছে মাটির কলস। কলসের ভেতর পাখি। গাছে গাছে পাখির কিঁচির-মিচির শব্দ। কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেল জীববৈচিত্র রক্ষায় পাখির নিরাপদ আবাস সৃষ্টির লক্ষ্যে জহির রায়হানই গাছে-গাছে মাটির কলস বেঁধেছেন। শুধু জীব বৈচিত্র রক্ষা-ই নয়, তিনি অসহায় দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশুনার খরচ বহন করেন রাস্তার দু’ধারে সবুজ গাছের সারি, ক্লান্ত পথিকের একটু স্বস্তির জন্য রাস্তার পাশে বেশ কয়েকটি ইটের তৈরী বসার স্থান, এলাকার বিভিন্ন স্কুল মাদরাসা ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষের বাড়ির আঙিনায় গাছের চারা রোপন, চাষিদের তৃষ্ণা লাঘবে মাঠের মধ্যে টিউবওয়েল স্থাপন, দরিদ্র শ্রেণির আমিষের চাহিদা মেটাতে বিলে মাছ অবমূক্ত করাসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে সম্পৃক্ত তিনি। সাদা মনের মানুষ(৪০) জহির রায়হান ঝিনাইদহ জেলার সদর উপজেলার কুমড়ো বাড়িয়া ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের দরিদ্র কৃষক কিয়াম উদ্দিন মোল্লার ছয় সন্তানের মধ্যে ছোট। জহির পেশায় একজন রঙ মিস্ত্রি। এ পেশায় তার যা আয় হয় তার অর্ধেক ব্যয় করেন সামাজিক কাজে। আর্থিক অনঠনে প্রাইমারীতে দুই তিন মাসের বেশি পড়াশুনা তার কপালে জোটেনি। তবে নৈশ বিদ্যালয়ে কিছুটা পড়ালেখা শিখেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত তিনি। স্ত্রী শাহানাজ পারভীন গৃহিনী। দুই ছেলে মেয়ের মধ্যে ছেলে বড়, মেয়ে ছোট। ছেলে তপু রায়হান (১৮) এইচ এস সিতে ও মেয়ে সুমাইয়া (১০)তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। জহিরের স্ত্রী তার সকল ভালো কাজে সাহায্য করেন এবং উৎসাহ দেন।

শুরুর কথাঃ
১৯৯০ সালের কথা। সমাজের জন্য কিছু করার মানসে কয়েকজন বন্ধু মিলে রাস্তার দু’ধারে গাছ লাগান শুরু করেন। কিন্তু রাস্তার পাশে গাছ হোক তা পছন্দ করতো না এলাকার মানুষ। তাই জহিরের উপর রাগ করে অনেকে গাছ উপড়ে ফেলতো। ভাগ্যক্রমে একটি বকুল গাছ বেঁচে ছিল। সেটিই জহির রায়হানের অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ালো। ২০০২ সাল থেকে তিনি আবার রাস্তার দু’পাশে গাছ লাগানো শুরু করেন। এবারে এলাকার মানুষের সহযোগিতা পেলেন। কেউ গাছ নষ্ট করলো না। কাজের স্বীকৃতি মেলায় আরো সামাজিক কাছে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে শুরু করেন তিনি।

সবুজ বনায়নঃ
‘বৃক্ষ রোপন করুন ধরিত্রীকে বাঁচান’, ‘বৃক্ষ আপনার দূর্দিনের বন্ধু’, ‘একটি বৃক্ষ একটি জীবন’, ‘বৃক্ষ পৃথিবীর পোষাক’, এমন অসংখ্য দেওয়াল লিখন দেখা যায় ঝিনাইদহ জুড়ে। জহির রায়হান নিজেই এইসব কথা দেওয়ালে লিখেছেন এবং নিজে গাছ লাগিয়ে পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার উদ্যোগে নিজ এলাকাসহ ঝিনাইদহের বিভিন্ন স্থানে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৮ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে।

                            05 - Copy
সরজমিনে নগর বাথান থেকে শুরু করে কুমড়া বাড়িয়া, রামনগর, ডেফলবাড়িয়া সহ বিভিন্ন এলাকায় জহিরের লাগানো গাছগুলো নজরে আসে। বকুল, বাবলা, মেহগুনি, নিম, অর্জুন আম, কাঠালসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন তিনি। স্বেচ্ছা শ্রমের ভিত্তিতে চালিত নাইট স্কুলের শিক্ষক কিসমত আলী শেখ জানান, জহিরের প্রচেষ্টায় রাস্তা, স্কুল, কলেজসহ এলাকাজুড়ে সবুজের সমারোহ হয়েছে। তিনি আরো জানান, কোন দরিদ্র পরিবারে সন্তান জন্ম নিলে জহির সেই বাড়িতে গিয়ে কমপক্ষে ২টি চারা গাছ রোপন করেন। জহির মনে করেন, গাছ সন্তানের মতো। গাছ কাউকে বঞ্চিত করে না। কোন না কোন ভাবে গাছ মানুষের উপকার করবেই। ঝিনাইদহের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস আদালতের খোলা যায়গায় এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৫-৬’শ টি বকুল গাছ লাগিয়েছেন বলে জহির জানান।

ক্লান্ত পথিকের বিশ্রামেঃ

Bosar bench 0002
গরমের দিনে ক্লান্ত পথিকের বিশ্রামের জন্য নগর বাথান-ডেফল বাড়িয়া রাস্তার পাশে ইটের তৈরী বসার স্থান নির্মাণ করেছেন জহির। গরমের দিনে গাছের ছায়ায় তার তৈরী বেঞ্চে পথচারীসহ এলাকার লোকজনকে বিশ্রাম নিতে দেখা যায়।

জীব বৈচিত্র রক্ষাঃ
বনভূমি কমে যাওয়ায় আগের মতো পাখি দেখা যায় না। তাই যে পরিমান গাছ আছে তাতেই পাখির জন্য নিরাপদ আবাস স্থল তৈরী করতে পারলে পাখির সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এই চিন্তা থেকে জহির রায়হান গাছে গাছে মাটির কলস বেঁধেছেন। পাখিরা সেখানে বিশ্রাম নেয়, বাসা বাঁধে, নিরাপদে বাস করে। জহির জানান, নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ায় এলাকায় এখন আগের থেকে পাখির সংখ্যা বেড়েছে।

শিক্ষানুরাগীঃ
সিমলা সদর উপজেলার নগর বাথান কলেজের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী। সিমলার ভাষায়, জহির কাকু যদি না থাকতো তাহলে আমার পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যেত। বাল্য বিয়ের কালো থাবা তাকে গ্রাস করে ফেলতো। সিমলা জানায়, ‘শুধু আমি একা নয়, সুমি, জেসমিন, সোহাগ, হালিমাসহ আরো অনেকে জহির কাকুর কাছ থেকে শিক্ষা সামগ্রীসহ পড়ার খরচ পেয়ে থাকি।’

নগর বাথান বাজারের অমিত লাইব্রেরীর স্বত্বাধীকারী অমিত জানান, এলাকার দরিদ্র শিক্ষার্থীরা তার দোকান থেকে তাদের প্রয়োজনীয় বই, খাতা, কলম নিয়ে যায়। যার মূল্য পরিশোধ করেন জহির রায়হান। অমিত জানান প্রতি মাসে কমপক্ষে জহিরকে ২হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয়।

কৃষকের পাশেঃ
গ্রীষ্মের তীব্র তাপ-দাহের সময় কৃষকদের মাঠে কাজ করতে কষ্ট হয়। তাই তিনি রামনগরের মাঠে নিজের টাকায় একটি টিউব ওয়েল স্থাপন করেছেন। মাঠে ছায়ার জন্য একটি গাছও লাগিয়েছেন তিনি। কাজের ফাঁকে সেই গাছের ছায়ায় কৃষক বিশ্রাম নেয়।

Goat distribute01p

গরমের সময় তিনি কৃষকদের মাঝে ফ্রি স্যালাইন বিতরন করেন। সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা করতে জহির প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে কৃষকদের মাতাল কিনে দেন। শীতে তাদের মাঝে কম্বল বিতরণ করেন।

প্রতিবন্ধীদের পাশেঃ
এলাকায় কমপক্ষে ১০ প্রতিবন্ধী পরিবারের বাড়ির আঙ্গিনায় নিজ হাতে শতাধিক গাছ লাগিয়েছেন জহির। এমন একটি প্রতিবন্ধী পরিবার রামনগরের বজলুর রহমানের(৫০)। বজলুর রহমান বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, স্ত্রীও একই রকম, মেয়ে ময়না(১৫)বাকপ্রতিবন্ধী, ছেলে সুমন(১২) অন্ধ। এই প্রতিবন্ধী পরিবারের সদস্যরা জহিরের প্রতি কৃতজ্ঞ। সুমন জানায়, জহির তাদের বাড়িতে নিজ হাতে আম, কাঁঠাল ও মেহগুনি গাছ লাগিয়েছেন। প্রতিবছর গাছে ভালো আম কাঁঠাল ধরে। এবছর তাদের দুটি ছাগলও দিয়েছেন, জানায় সুমন ।

আমিষের চাহিদা মেটাতেঃ
এ বছরে বৃষ্টির পরিমান বেশি হওয়ায় খালে বিলে পানি জমেছিল বেশ। ‘জাল যার জলা তার’ এটি জানে জহির। তাই নিজ এলাকার কৃষক ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষের আমিষের চাহিদা মেটাতে রাম নগর কাইতের বিলে এ বছরে ৩০ কেজি বিভিন্ন মাছের পোনা অবমূক্ত করেন তিনি ।

ভ্রাম্যমান পাঠাগারঃ
‘বই পড়লে জ্ঞান বাড়ে।’ ‘শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একজন মানুষর জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করতে পারেনা।’ তাই সমাজের মানুষের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে জহির ছুটে যান এলাকার মানুষের ঘরে ঘরে।

book bili razu 000

জহির রায়হানের ভ্রাম্যমান পাঠাগারের সদস্য বর্তমানে ৫০ জনের বেশি। প্রতিদিন নিজের পাঠাগারের বই সাইকেলের বেঁধে ছুটে যান পাঠকের বাড়িতে। একজন পাঠককে একটি বই এক সপ্তাহের জন্য দেন। সপ্তাহ শেষে পুরানো বই নিয়ে আসেন, দিয়ে আসেন নতুন বই। জহিরের পাঠক ভবানীপুরের আব্দুল ওয়াহাব ও ডেফলবাড়ির গৃহীনি মালা বলেন, জহিরের কারণে বাড়িতে বসে বিভিন্ন বই পড়ার সুযোগ হয়েছে। জহির জানায় তার পাঠাগারে ধর্মীয়, উপন্যাস, ইতিহাস ভিত্তিক বইসহ নানা ধরনের প্রায় ২ শতাধীক বই আছে।

নিরাপদ আশ্রয়ঃ
হালিমা(১৪) পেয়েছে নিরাপদ আশ্রয়। মাতৃহীন হালিমা ভালোই ছিলো এক নিঃসন্তান দম্পতির আশ্রয়ে। ৭ বছর বয়সে তারা হালিমাকে দত্তক নেয়। ৬বছর ভালোই ছিলো তাদের কাছে। কিন্তু ওই দম্পতির বিচ্ছেদে আবার আশ্রয় হারা হয়ে পড়তে হয় তাকে। ফিরেআসতে হয় পাগল বাবার বাড়ি শৈলকুপার অচিন্ত্যপুর গ্রামে। এরপর এ বাড়ি ও বাড়ি খেয়ে না খেয়ে পড়াশুনা করতো হতে তাকে। নগর বাথান স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী হালিমা একদিন কষ্টের কথা জানালেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল খালেক স্যারকে। তিনি খোঁজ দেন জহির রায়হানের। এর পর আশ্রয়ের জন্য জহির রায়হানকে ফোন দেয় হালিমা। প্রথমে রাজি না হলেও পরে স্ত্রীর অনুরোধে হালিমাকে রাখতে রাজি হন জহির। হালিমা জানায় এ বছর রমজান মাসে সে জহির রায়হানের বাড়িতে আসে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে হালিমা বলে, নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছি, ভালো আছি । নতুন বাবা মা তাকে নিজের সন্তানের মতো আদর স্নেহ করেন।

জন প্রতিনিধির বক্তব্যঃ
কুমড়া বাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হায়দার আলী বলেন, পেশায় একজন সামান্য রঙ মিস্ত্রি হয়েও দরিদ্র জহির নিজের আয়ের একটি অংশ সমাজের দরিদ্র শ্রেণির জন্য ব্যয় করেন, পরিবেশ নিয়ে ভাবেন, গাছ লাগান, দেওয়াল লিখনের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করেন, এমনকি পাখির জন্যও নিরাপদ আশ্রয় তৈরী করেন-সমাজে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। চেয়ারম্যান হায়দার আলী মনে করেন সমাজের কল্যাণে জহির রায়হানের মতো আরো অনেকে যদি এগিয়ে আসতো তবে খুব দ্রুত আমাদের সমাজে পরিবর্তন আসতো। তিনি আরো বলেন, জহির শুধু আমাদের ইউনিয়নের গর্ব নয়, সে দেশের গর্ব। সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতায় যদি একটি স্থায়ী ফান্ড তৈরী করা সম্ভব হতো এবং সেটি সমাজসেবক জহির রায়হানকে দিয়ে পরিচালনা করতে পারলে তার এ সামাজিক কাজ আরো দীর্ঘায়িত হতো বলে মনে করেন চেয়ারম্যান হায়দার আলী।

মন্তব্য করুন